সামির অনেকটা ছটফট করতে করতেই এপাশ-ওপাশ হচ্ছে। দূর থেকে একটা শব্দ যেন তাকে ডাকছে। ধীরে ধীরে কাছে আসছে। আরও কাছে, একদম কানের কাছেই যেন কেউ একজন ডাকছে। ঘুম ভেঙ্গে গেল তার। সমস্ত শরীর ঘামছে। একটু স্বাভাবিক হতেই সে বুঝতে পারলো বেশ রাত থেকেই বিদ্যুৎ নেই। সেজন্য শরীর এভাবে ঘেমেছে। নিজেকেই বিড়বিড় করে সামির প্রশ্ন করলো – তাহলে শব্দটা কিসের?
প্রতিদিন ফজের নামাজের পর জানালা খুলে দিয়ে আবার ঘুমানো তার অভ্যাস। ফজরে নিয়মিত এ্যালার্ম দেয়। তখনই ফোনটা বেজে উঠলো। তখন সে বুঝতে পারলো শব্দটা কিসের ছিল। নিয়মের ব্যাঘাত ঘটিয়ে আজকে সামির নামাজ শেষে জানালা না খুলেই দেয়ালে হেলান দিয়ে খাটে বসে থাকলো সকাল পর্যন্ত।
সকাল থেকে রেদওয়ান ৪ বার ফোন দিয়েছে। একবারও ফোন ধরেনি সামির। সকালের আলো যখন বাড়তে শুরু করলো তার মনে পড়লো আজ রেদওয়ানের আসার কথা ছিল। কিন্তু সে ভুলেই গেছে।
আবার সে চিন্তা করতে লাগলো - তার সাথে এসব কি হচ্ছে আজ! আগে কখনই এমন হয়নি তার সাথে।
রেদওয়ানের সকালে আসার কথা থাকলেও সকালে আসবে না। আসবে দুপুরের দিকে। এ নিয়ে সামিরের বেশ মন খারাপ। কয়েকদিন ধরেই সে রেদওয়ানের জন্য অপেক্ষায় আছে। মনের সমস্ত জমানো কথা রেদওয়ানকে বলার জন্য ব্যাকুল।
সামির বেশ কয়েকদিন ধরেই কি নিয়ে যেন সারাক্ষণ চিন্তা করে। কিন্তু কাকে কথাগুলো বলবে তা ঠিক করতে পারছিলো না। রেদওয়ান তার খুব কাছের বন্ধু। তৃতীয় শ্রেণি থেকেই তার সাথে পরিচয়। তারপর থেকেই একে ওপরের মনের কথা আদানপ্রদান করা। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে দুজনে অনেক কথা একেঅপরকে বলেছে। কিন্তু এবার সামিরের কেন যেন সংকোচ লাগছে কিছু বলতে।
সারারাত ভেবেছে কীভাবে তার বন্ধুকে কথাগুলো বলবে! কতটা বলবে! এইসব চিন্তা করতে করতেই সামির যে কখন ঘুমিয়েছিলো রাতে!
সামিরের ডাক পরলো। মা ডাকছে। নাস্তার জন্য,
- সামির নাস্তা খেতে আয়। তোর পছন্দের নুডুলস রান্না করেছি।
- আসছি মা। ফ্রেস হয়ে আসছি।
- এখনো ফ্রেস হসনি! কি ভাবিস এতো? কাল থেকে দেখছি উদাস হয়ে আছিস। কি হয়েছে বলতো।
(সামির নিজেকে সামলে নিয়ে) - না মা, কিছু হয়নি। পরশু যাচ্ছিতো, এইবার অনেকদিন থাকলাম, তা ভেবেই মন খারাপ।
- হয়েছে, হয়েছে! আর মন খারাপ করে থাকতে হবে না। তাড়াতাড়ি কর। (মা ঠিকই বুঝতে পেরেছে কিছু একটা হয়েছে।)
মা-বাবার সাথে অনেক গল্প করতে করতে নাস্তা শেষ করে চা বানাতে গেল সামির। সে না থাকলে মা-বাবার চা ঠিক মত খাওয়া হয় না। মা তখনই বলে উঠলো, তুই নেই, চা খাই কিভাবে! সব সময়তো তুই চা বানাস।
সামিরের চোখ ছলছল করে উঠলো। নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে একটু উঁচু গলায় সে বললো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হয়েছে। আর বলতে হবে না। বলো যে, আলসেমি করে চা বানিয়ে খাও না। এই বলে সে রান্না ঘরে গেল।
টিভির রুমে একসাথে চা খাচ্ছে আর খবর দেখছে। সামিরের ভাই নেই, গতকাল ঢাকায় ফিরেছে। সামির চা মুখে দিয়ে মনে মনে ভাবছে, চা যে খুব ভাল হয়েছে তাতো না। তাও কেন সবাই প্রশংসা করে!
বুক সেলফ থেকে শীর্ষেন্দু'র সোনার মেডেল বইটা নিয়ে নিজ রুমে গেল। বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে অপেক্ষা করছে রেদওয়ানের জন্য। এক নিমিষেই বইটার বেশ কয়েক পাতা পড়ে শেষ করলো। ইদানিং সামিরের গল্পের বই পড়ার নেশা খুব ধরেছে। যদিও আর অল্প কিছুদের মধ্যেই অনার্স জীবন শেষ করতে যাচ্ছে সে। সে হিসেবে পড়ার নেশায় ধরা রোগ বেশ দেরিতেই শুরু হয়েছে বলা যায়। কিন্তু তাতে কি! সামির পড়ার মুহূর্ত বেশ উপভোগ করে। রাতের হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া, কয়েকদিনের চিন্তা - এই বিষয়গুলো ভুলে থাকতে পেড়েছে বই পড়ে।
বইটির ঠিক কোথায় ছেড়েছে তা না দেখেই সামির দৌড় দিয়ে মার কাছে গেল। মা তার দৌড়ানো দেখে বললো, কী হয়েছে বাবা। সামির বললো, একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। আজকে সকালে রেদওয়ানের আসার কথা ছিল। কিন্তু সে সকালে আসবে না। বলেছে যে দুপুরের দিকে আসবে। তাই যাই রান্না কর না কেন একজনের জন্য বেশিই রান্না কর। মা বললো, আচ্ছা। এই বলে মা মুচকি হাসলেন।
সামির তার ঘরে যাওয়ার সময় মাথায় একটা বাড়ি দিয়ে বিড়বিড় করলো, বইটাতে মার্ক করা হয়নি। আচ্ছা সমস্যা নেই, বইটাতো ছোটই। খুঁজে নিতে সমস্যা হবে না। সে ঘরে না গিয়ে সোজা ছাঁদে চলে গেল। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করবে।
সামিরদের বাসায় কলিং বেল লাগানো নেই। কেউ আসলে সাধারণত দরজায় ঠোকা দেয়। কিন্তু ছাঁদ থেকেই শোনা গেল কেউ সামির, সামির করে ডাকছে। গতকাল থেকে সামির যার অপেক্ষায় ছিল সে এসেছে। ছাঁদ থেকে নামতেই দুজনের দেখা হয়ে গেল। একেঅপরকে কোলাকুলি করলো তারা। তারপর সরাসরি দুজন সামিরের ঘরে ঢুকলো।
এমন নয় যে বেশ অনেকদিন পর রেদওয়ানের সাথে দেখা হচ্ছে। কিন্তু মনটা খারাপ থাকায় সামির তার বন্ধুর সাথে দেখা করার জন্য বেকুল ছিল। খাটে দুজন বসতেই সামির গতকালসহ কয়েকদিনের মন খারাপের কথা জানালো। রেদওয়ান মুখের উপর সরাসরি বলেই ফেললো, ধুর মিয়া! তোমার খালি মন খারাপ হয়। এতো মন খারাপ কর কেন? বড় হইছোতো। এখন এইগুলাকে নিজে থেকেই সামাল দিতে হয়। সামির এধরনের কথা শুনতে অপ্রস্তুত ছিল। বিষয় ও মুহূর্তটাকে কাঁটানোর জন্য সামির বললো, চা না কফি। রেদওয়ান বললো, কফি। সামির কফি বানানোর জন্য রান্না ঘরের দিকে চলে গেল।
অন্য সময় কফি বানানোর জন্য পানি গরম দিয়ে সামির আবার ঘরে এসে বন্ধুদের সাথে কথা বলে। বারবার যেয়ে দেখে আসে। কিন্তু আজকে একবারের জন্যও রান্নাঘর থেকে বের হয়নি। রান্নাঘরেই নানা চিন্তা করছিলো। রেদওয়ানের কাছ থেকে এরকম ব্যবহার তার খুব খারাপ লেগেছে। রেদওয়ানই একমাত্র বন্ধু যার কাছে আলাদাভাবে কিছু কথা শেয়ার করতে পারে সামির। কিন্তু আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পাড় করছি দেখে এভাবে কথা বলবে তা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। কালকে থেকেই অনেক অপেক্ষায় ছিল বন্ধুর কাছে কথাগুলো বলে কিছুটা হালকা হবে। কিন্তু এই আচরণের পর শেয়ার করার কোনো প্রশ্নই উঠে না। তাই সামির ঠিক করলো, সে রেদওয়ানকে তার মন খারাপের মূল কারণ বলবে না। রেদওয়ান যদি কিছু জানতেই চায় তাহলে সে রাহার কথা বলে কাঁটিয়ে দিবে।
সামির কফি নিয়ে তার ঘরে ঢুকলো। রেদওয়ানকে কফি এগিয়ে দিল। রেদওয়ান প্রথম সুযোগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিল। তাই তার বিএসসি এতদিনে শেষ। তার চাকরি ভালো লাগতো না বিধায় একটা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছে। সে বিষয়েই কথা বলে যাচ্ছিল সে। সামির তার কথা শুনে যাচ্ছে। মনে মনে এখনো আশা রেখেছে যে, রেদওয়ান সেই আগের মত তাকে জিজ্ঞেস করবে – কি হয়েছে বন্ধু? কি নিয়ে ভাবছিস এত! আমাকে খুলে বল। কিন্তু না, রেদওয়ান তার ব্যবসা ও নিজের কথাই বলে যাচ্ছে।
রেদওয়ানের কথাগুলো কেন যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কানে আসছে না তার শব্দ। এখন কানে বাজছে রাহার সাথে গতকালের হওয়া কথোপকথন।
- খুবই হাস্যকর বিষয়।
- মোটেই না।
- তাহলে এতো হাসছো কেন?
- বাহিরের লোকজন যাতে আমার কষ্টটা বুঝতে না পারে।
- লোকদেখানো?
- বলতে পারো।
- তুমিতো এমন ছিলানা।
- এখন হয়েছি। তাতে কি?
- এমনটা কেন?
এরপর আর কথা এগোইনি। সামিরের নিজেরও কথা বলতে ইচ্ছা করেনি।
সামির একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চিন্তা করে, লোক দেখানো বিষয় সে কখনই বুঝতো না। নিজে কখনও লোকদেখানো কাজ করতেও পারতো না। কিন্তু আজ পারে। অস্পষ্ট ভাষায় বলে ফেললো, তোমার কাছ থেকেইতো শিখেছি, রাহা।
রেদওয়ান - কি বলো ফিসফিস করে।
সামির - কিছু না।
আবার নিজের দুনিয়ায় চলে যায় সামির। ভাবতে থাকে, দুনিয়াটা প্রকৃত পক্ষ্যেই এতোটা নিষ্ঠুর, নাকি আমরা নিজেরা দুনিয়াটাকে নিষ্ঠুর বানিয়েছি!
রাহা প্রয়োজন ছাড়া সামিরকে ফোন দেয় না। শুধু প্রয়োজনের সময়ই সামিরের ফোনে রাহার নাম ভেসে ওঠে। সামির এ নিয়ে রাহাকে অনেক কথা শুনিয়েছে, অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছে। কিন্তু রাহা কোনো উত্তর দেয় না। চুপ থেকে, কোনো একটা বাহানা করে ফোন কেঁটে দেয়। সামির বারবার ফোন দিয়ে নিজেই ক্লান্ত হয়ে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে। কিন্তু সামিরের জীবনতো রাহাকে ছাড়া চলবে না। তাই শত অপমান, অবহেলা সত্ত্বেও সে রাহার পিছু পিছু ঘুরতে থাকে। রাহা প্রয়োজনমাফিক সামিরকে পাত্তা দেয়, আর বাঁকিটা সময় শুধুই অবহেলা করে।
চিন্তার ঠিক এ পর্যায়ে সামিরের কাঁধে হাত রাখে রেদওয়ান। বলে, আমাকে এখন যেতে হবে। সামির তার বন্ধুকে আরেকটু থাকার অনুরোধ করতে যেয়েও থেমে গেল। একটু রাগ করেই হয়তো আর কথা বললো না সে। বরং তাকে বিদায় জানিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে সেই বইটা হাতে নিল। কিন্তু এখন সে পড়ছে না। আবার ভাবছে। ভাবছে, এতক্ষণ যে রাহার কথা মাথায় এসেছিল তা যদি রেদওয়ানকে বলতো তাহলে নির্ঘাত সে এটাকেই মূল কারণ হিসেবে ধরে নিত। রেদওয়ানের যেহেতু কিছু শোনার আগ্রহই ছিল না, তাই না বলে ভালোই হয়েছে। এমনিতেই যে ব্যবহার করেছে তা এখনো সে মাথা থেকে সরাতে পাড়ছে না।
এভাবেই এটা-ওটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। সামির নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে টিভির ঘরে গেল। মা টিভি দেখছে। মাকে জিজ্ঞেস করলো, চা খাবা। মা না করলো না। সামির যেহেতু চলে যাবে তাই দুজনে একসাথে বসেই চা খেল। অন্য সময় সামির নিজের ঘরেই খেয়ে থাকে।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সামিরের আবার চিন্তাগুলো মাথায় আসতে শুরু করেছে। সে নিজেকে বারবার প্রশ্ন করতে থাকলো, রাহা যদি আমার মূল সমস্যা না হয়ে থাকে তাহলে সমস্যাটা কোথায়! এটাই বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করতে থাকলো। একসময় বিরক্ত হয়ে একটা সিনেমা দেখা শুরু করলো। সিনেমা চলতে চলতেই ঘুমিয়ে পড়লো সে।
পরদিন ভোরেও একইভাবে তাকে কোনো একটি শব্দ বারবার ডেকে যাচ্ছে। ছটফট ভাব নিয়েই সামির ঘুম থেকে উঠে ফোনে বাজতে থাকা অ্যালার্ম বন্ধ করলো।
No comments:
Post a Comment