Monday, January 31, 2022

ভ্যান-ডুয়েলিং ও মন খুলে কথা বলা

Nomadland সিনেমাটি দেখেছেন? সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছেন 'ফার্ন' নামের একজন নারী। যিনি পার্টটাইম কাজ করেন এবং তার ভ্যান নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। ভ্যানেই থাকেন। যারা স্থায়ীভাবে বা অস্থায়ী হলেও কিছু সময় গাড়িতে থাকেন তাদের ভ্যান-ডুয়েলার বলা হয়।


আমাদের দেশে যেসব মাইক্রোবাস দেখা যায় তারচেয়ে আকারে কিছু বড় এমন ভ্যান গাড়িকে নিজের পছন্দমতো সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে থাকার উপযোগী করা হয়। আবার রেডিমেড কিনতেও পাওয়া যায়। যদিও আমাদের দেশের হিসেবে ভ্যান-ডুয়েলিং করা যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ। তবে যথেষ্ট রোমাঞ্চকর। 


বাংলাদেশে যদিও এর প্রচলন নেই। তবে বিদেশে বেশ জনপ্রিয়। যে জায়গায় ঘুমাচ্ছেন সেটাই মহাসড়কে চলছে! বিষয়টা ভালো লাগতে বাধ্য। আপনার সাথে যদি সঙ্গী থাকে তাহলেতো কথাই নেই। দেখা গেলো আপনি ঘুম থেকে উঠছেন, এদিকে গাড়ি চলছেই। আপনার সঙ্গীকে সুপ্রভাত জানিয়ে ব্রাশ হাতে নিয়ে সামনের আসনে বসে গেলেন। 


তবে স্থায়ীভাবে থাকা বেশ কষ্টের। বিশেষকরে পায়খানা ও গোসলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝামেলা হয়ে যায়। যদিও কিছু ভ্যানে ওয়াশিং মেশিনসহ ছোট আকারে গোসলখানারও ব্যবস্থা দেখেছি। তবুও কাজগুলো শান্তি মতো করতে পারবেন না।


ফিরে আসি ফার্নের কাছে। ফার্নের যথেষ্ট বয়স হয়েছে৷ উনি মোটামুটি স্থায়ীভাবেই ভ্যানে থাকতে শুরু করেন। একাই থাকেন। যখন অর্থের প্রয়োজন হয় তখন আমাজনের মতো বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করেন। ততোটুকুই কাজ করেন যতোটা অর্থের প্রয়োজন। তিনি যে সমস্যায় পড়েন তা হল পার্কিং নিয়ে। কারণ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে রাতে পার্ক করার অনুমতি থাকে না। আবার বিভিন্ন জায়গায় পার্ক করার জন্য অর্থ দিতে হয়। এর অবশ্য একটা সমাধান আছে, আর তা হল ভ্যান-ডুয়েলারদের বিভিন্ন গ্রুপ আছে। তাদের সাথে যোগাযোগ করা। তারা সাধারণত পাহাড়ের আশেপাশে সমতল ভূমিতে একত্রিত হয়। সেখানে কিছু সময় কাটায়। 


যদিও এটাও স্থায়ী সমাধান না। সাথে যখন ভ্যান থাকে তখন স্থানীয়ভাবে নির্দিষ্ট এক জায়গায় থাকার কোনো মানেও নেই। তবে এইসব জায়গায় থাকার একটা বড় সমস্যা হল পানি।


যাই হোক, সুবিধার কথায় আসি। এই গ্রুপগুলো অনেকটাই সম্প্রদায়ের মতো আচরণ করে। প্রতি সন্ধ্যায় ক্যাম্প-ফায়ারের আয়োজন করা হয়। নির্দিষ্ট কিছুদিনে বিনিময় ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়। অর্থাৎ আপনার তেমন একটা প্রয়োজন নেই এমন দ্রব্যের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় কিছু একটা নেওয়া।


সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক যা লেগেছে তা হল, যখন ক্যাম্প-ফায়ার শুরু করা হয় তখন আগুনের চারিদিকে সবাই গোল হয়ে বসে। এদের মধ্যে যিনি বয়োজ্যেষ্ঠ বা এইক্ষেত্রে অভিজ্ঞ তিনি কিছু কথা বলেন তারপর একএক করে সবাই তাদের কথা বলেন। নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নেই। ধরুন আপনার জন্য পাঁচ মিনিট নির্ধারিত।  আপনি এই সময়ে আপনার জীবনের কথা বলতে পারেন বা কোনো চিন্তাভাবনা। অন্যদের ক্ষেত্রে তখন শর্ত একটাই, আর তা হল কোনো বাধা না দিয়ে ঐ পাঁচ মিনিট শুনে যাওয়া।


তাহলে এক ঘণ্টার একটা বৈঠক হলে আপনার পাঁচ মিনিট বাদে বাকি ৫৫ মিনিট আপনাকে শুনতে হবে। তাহলে বিষয়টি যা দাঁড়ায় - আপনি শুনতে শুরু করছেন। অন্যকে শ্রদ্ধা করছেন। শোনার মাধ্যমে আপনি অনেকজনকে জানতে পারছেন। যিনি বলছেন তিনি অনেক না বলা কথার কিছু কথা বলতে পারছেন। যেহেতু এখানে সবাই অপরিচিত তাই এটা ভাবতে হচ্ছে না যে কে কী ভাববে।


এই বৈঠকের পর যে যার মতো বসে গল্প করে। যেহেতু এই ভ্যান-ডুয়েলিংয়ে অন্যান্য নানাধরনের সুযোগসুবিধা থাকে না তাই বিনোদনের একটা বড় মাধ্যম হলো অন্যের সাথে কথা বলা। 


এই সিনেমায় যাদের দেখিয়েছে তাদের সবারই ব্যক্তি জীবনে বড়ধরনের দুঃখ ছিল। তাই কেউ কাউকে অশ্রদ্ধা করেনি। সবাই সবার কথা শোনার চেষ্টা করেছে। 


সিনেমাটি দেখে যা মনে হল, এভাবে কথা বললে স্থায়ীভাবে শান্তি/সমাধান পাওয়া যায় না। কারণ সমাধানের ক্ষেত্রতো এই ভ্যানলাইফ না। সমাধানের জন্য সমাজে ফিরতেই হবে, পরিবারে যেতেই হবে, কাছের মানুষের সংস্পর্শে আসতেই হবে। কিন্তু চিন্তাজগতে সেই ফিরে যাওয়ার তাগিদ দেয়। নতুন করে ভাবতে শেখায়। আপনার ভাবনায় শুধু হতাশাজনক ভাবনার পরিবর্তে ইতিবাচক কিছু ভাবতেও সাহায্য করে। 

Some Recent Posts

রুমাল ও চাবির গল্প

রাতে না খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। দীর্ঘ ঘুম। সকালে উঠেই দেখি হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে। সেদিকে নজর না দিয়ে কিছু খেতে হবে এই চিন্তা শ...